শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

পাচারের চেয়ে বিদেশে অর্থ লেনদেন বেশি ক্ষতিকর

এম এ খালেক

অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গত à§§ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে বিদ্যমান অর্থনীতির যে চিত্র পাওয়া গেছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। বিগত পতিত সরকার আমলে অর্থনীতির বিভিন্ন সাফল্যের কল্পকাহিনী প্রচার করলেও বাস্তব অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত সরকারের সাড়ে à§§à§« বছরের ধারাবাহিক শাসনামলে দেশের অর্থনীতিকে লুটপাটের মাধ্যমে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে à§§ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থ পাচারকার্যে যুক্ত ছিলেন অসৎ রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়রা। অনেকেই তাদের পাচারকৃত অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি, ফ্লাট ক্রয় করেছেন। দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের ৫৩২টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে à§© হাজার ৬০০ বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। অনেকে আবার ব্যবসায়-বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। অর্থ পাচার কাজে জড়িতদের অনেকের পরিবার বিদেশে অবস্থান করছেন। বিগত সরকারের আমলে আমলারা আড়াই লাখ কোটি টাকা শুধু ঘুস গ্রহণ করেছে। এদের অর্থের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। 

বিগত সরকার আমলে স্বজনতোষণের মাধ্যমে কিছু মানুষকে বিত্তবান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশে অতীতে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকার প্রধান ছিলেন এমন অনেকের বিরুদ্ধেই নানা ধরনের দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এভাবে পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতিকে আর কোনো সরকার আমলে ধ্বংস করার চেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। দেশকে পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। তথাকথিত উন্নয়নের নামে দেশের অর্থ একটি বিশেষ মহলকে লুটে নেবার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, গত সরকারের আমলে অবকাঠামোগত খাতে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। সাধারণত একনায়কতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা কায়েম থাকলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেশি হয়। কারণ উন্নয়নের নামে অর্থ লোপাট করার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত খাতের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের এই অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে। এখনো গ্রামে-গঞ্জে গেলে আইয়ুব খানের উন্নয়ন কার্যক্রম চোখে পড়ে। রাজধানীর বিখ্যাত অনেকগুলো স্থাপনা আইয়ুব খানের আমলে তৈরি করা। দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের মানুষ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসন আমলে। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বেশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে বিগত সাড়ে à§§à§« বছরে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। আইয়ুব খান যেমন উন্নয়নের দশ বছর পূর্তি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করেছিল বিগত সরকারও ঠিক তেমনিভাবে উন্নয়নের ১০ বছর পালন করে। একনায়কতান্ত্রিক সরকার আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেশি হয় এই কারণেই যে, এর মাধ্যমে অর্থ লোপাটের সুযোগ পাওয়া যায়। কিভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে অর্থ লোপাট করা হয় তার কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশের অনেক স্থানে সরকারি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার খবর আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। বিভিন্ন স্থানে এমন সব ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে যাতে উঠার জন্য কোনো সংযোগ সড়ক নেই। বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকালে যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল তা অনেক ক্ষেত্রেই ফিকে হয়ে আসতে শুরু করেছে। উন্নয়নের নামে কিভাবে অর্থ লোপাট করা হয়েছে তা পরিসংখ্যানের প্রতি দৃষ্টি দিলেই অনুধাবন করা যাবে। 

বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। চার লেনের এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সড়ক নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৬৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। অথচ ভারতে একই আয়তনের সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় মাত্র ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। একই ধরনের একটি সড়ক নির্মাণে পাকিস্তানে ২৯ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, ফিলিপাইনে à§§à§§ লাখ মার্কিন ডলার, চীনে ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার এবং তুরস্কে ব্যয় হয় à§§à§­ লাখ মার্কিন ডলার। সড়ক নির্মাণের জন্য এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণ কী? বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের নামে সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি মহলকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেবার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। বিগত সরকার আমলে বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। যেসব খাতে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তাদের চুক্তিগুলো পুন:মূল্যায়ন করা যেতে পারে। বিগত সরকার আমলে অবকাঠামোগত খাত তথা অনুৎপাদনশীল খাতের উন্নয়নে যেভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে উৎপাদনমূলক খাতে সেভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়নি। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ব্যতীত কোনোভাবেই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু বিগত অনেক দিন ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপি’র ২২/২৩ শতাংশে উঠানামা করছে। সরকার সমর্থক একটি গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা শিল্পে বিনিয়োগ না করে বিদেশে পাচার করেছে। যে অর্থ দেশের উন্নয়নে ব্যয়িত হতে পারতো তা বিদেশী নিয়ে অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে। এটা দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষেই সম্ভব। দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের সঙ্গে আমার আলাপকালে তিনি অর্থ পাচারকে একটি জটিল সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো না প্রতি বছর কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। তবে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ যে উদ্বেগজনক তা বলা যেতে পারে। অর্থ পাচার পদ্ধতিও অভিনব। আমরা সাধারণভাবে মনে করি, পাচার অর্থ হচ্ছে দেশ থেকে টাকা বিদেশে চলে যাওয়া। কিন্তু বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে আনা হয়নি। কাজেই আমরা জানতেও পারছি না কী পরিমাণ টাকা দেশে না এসে বিদেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদেশে উপার্জিত অর্থ যদি দেশে আসতো তাহলে দেশ সেই টাকা ব্যবহার করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারতো। 

দেশ থেকে টাকা বিদেশে চলে যাওয়াকে আপনি অর্থ পাচার বলতে পারেন। এ ধরনের অর্থ পাচার রোধে আপনি হয়তো বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু যে টাকা বিদেশ থেকে দেশেই আসেনি সেটা আপনি কিভাবে ধরবেন? সেই টাকা কিভাবে উদ্ধার করবেন? কাজেই আমি মনে করি,পাচারকৃত অর্থ এবং যে অর্থ বিদেশ থেকে দেশে আসেনি সেটা ফিরিয়ে আনার কাজটি খুব সহজ হবে না। 

তিনি আরো বলেন, দেশ থেকে যে অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে তার পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে না আসা। এটা ধরারও কোনো সহজ পন্থা নেই। পাচারকৃত অর্থ হয়তো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কিন্তু এ ধরনের টাকার পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়। মূল সমস্যা সৃষ্টি করেছে বিদেশে উপার্জিত টাকা দেশে না আসার   à¦ªà§à¦°à¦¬à¦£à¦¤à¦¾à¥¤  সরকারের নেতৃবৃন্দ এমন কী আমলা পর্যায়ের ব্যক্তিদের অনেকেরই পরিবার দেশে নেই।  দেশের অভ্যন্তরে অবৈধ অর্থের লেনদেন করতে নানা সমস্যা হতে পারে। তাই অনেকেই এখন আর দেশে অবৈধ অর্থের লেনদেন করেন না। তারা বিদেশে এই লেনদেন করেন। বিদেশে অবৈধ অর্থের লেনদেন ইচ্ছা করলেই বন্ধ করা যাবে না। এটা চলতেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত আমরা বিদ্যমান আইন-কানুনগুলোকে হালনাগাদ করতে না পারবো। অর্থপাচার বা দুর্নীতির মাধ্যমে যে অর্থ পাচার হচ্ছে তার পরিমাণ দেখে যদি কেউ মনে করেন আমরা বড় ধরনের আবিষ্কার করে ফেলেছি তাহলে ভুল হবে। আমরা শ্বেতপত্র প্রণয়ন করতে গিয়ে একটি চমৎকার বিষয় অনুধাবন করতে পেরেছি তাহলো, সাধারণভাবে মনে করা হয়, ঘুস, চাঁদাবাজির মাধ্যমে দুর্নীতিলব্ধ অর্থ উপার্জন করা হয়। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি ২৮ ধরনের পন্থায় দুর্নীতি করা হয়। দুর্নীতিটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে, ঘুস প্রদানকে মনে হবে বকশিস প্রদানের মতো। আমাদের দেশে দুর্নীতিকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়নি এটাকে এক সৃজনশীল শিল্পে পরিণত করা হয়েছে। দুর্নীতির কাজগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করা হয় এবং প্রতিনিয়তই নতুন নতুন দুর্নীতির কৌশল আবিষ্কৃত হচ্ছে। সব দুর্নীতি যে রাজনীতিবিদরা করেছেন তা নয়। সরকারি আমলা থেকে শুরু করে যাদের ন্যূনতম সুযোগ আছে তারাই দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য এর মধ্যেও ব্যতিক্রম কিছু ভালো মানুষ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই আছে। রাজনীতিবিদগণ দুর্নীতি করেন আমরা তাদের দোষারোপ করি। কিন্তু রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির পেছনে যারা কারিগর হিসেবে কাজ করছে তাদের যদি চিহ্নিত না করা হয় তাহলে তারা আরো অনেক দূর পর্যন্ত যাবেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্র ড. আব্দুল মোমেন একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, তিনি যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন কানাডার বেগমপাড়ায় বাংলাদেশীদের বাড়ি এবং সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন সেখানে যারা বাড়ি বা সম্পদ ক্রয় করেছে তাদের বেশির ভাগই সরকারি কর্মকর্তা। আমরাও এ ধরনের কথা শুনেছি। তবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য প্রমাণিত নয়। কাজেই এ ব্যাপারে নিশ্চত হয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে, শুধু কানাডায় নয়, দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশেও বাংলাদেশীদের বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে। 

অনেকেই প্রশ্ন করেন, যে দেশে অর্থ পাচার হয়ে যায় সেই দেশ যদি সহায়তা না করে তাহলে কি পাচারকৃত অর্থ এবং তা দিয়ে ক্রয়কৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে? পাচার বলতে যদি বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়াকে বুঝায় তাহলে তার পরিমাণ খুবই সামান্য। বরং উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, বিদেশে যে অর্থ উপার্জিত হচ্ছে তা দেশে আসছে না। অর্থাৎ যে অর্থ দেশে লেনদেন হবার কথা ছিল তা বিদেশেই লেনদেন হচ্ছে। এর পরিমাণ অত্যন্ত বেশি এবং উদ্বেগজনক। বিদেশে যে অর্থ উপার্জিত হচ্ছে তা দেশে আসেনি কিন্তু আমার অ্যাকাউন্টে তা খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে, দুর্নীতি করার জন্য প্রচলিত আইন বদলে ফেলা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তব কার্যকারিতা ছিল না। নিজের পছন্দের মানুষকে কাজ দেবার জন্য বিভিন্ন সময় নীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। কোনো কাজে যদি দায়মুক্তি পাওয়া যায় তাহলে সেখানে তো দুর্নীতি হবেই। এক সময় আমরা দুর্নীতি বলতে সরাসরি লেনদেনকে বুঝতাম। এখন দুর্নীতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, নগদ অর্থ উৎকোচ দেয়াকে বকশিস মনে হয়। বিদেশে আর্থিক লেনদেন কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে কিছুটা হলেও অনুমান করা যেতে পারে। কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিন্যান্সিয়াল ইনট্রিগ্রিটি তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬৪ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে লেনদেন হয়ে থাকে। পণ্য আমদানিকারকগণ আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অর্থাৎ ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ প্রেরণ করে। সেই অর্থ বিদেশেই লেনদেন হয়। আবার রপ্তানিকারকগণ রপ্তানিকৃত পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেখিয়ে অর্থাৎ আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে রেখে দিচ্ছে।

যেসব বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে কাজ করছেন তারা প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে প্রেরণ না করে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠাচ্ছেন। এটা হয়েছে মূলত মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করে রাখার কারণে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাজারে মার্কিন ডলারের প্রচন্ড চাহিদা লক্ষ্য করা গেছে। সেই সময় কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় অন্তত ৭ থেকে ৮ টাকা বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছিল। সঙ্গত কারণেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশীরা চাইলেই কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে লেনদেন করতে পারেন না। আর হুন্ডি ব্যবসায়িরা তাদের আবাসস্থলে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে থাকেন। বিদেশে আর্থিক লেনদেন হবার কারণেই প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয় ঠিক মতো দেশে আসছিল না। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করি, বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ক্রলিং পদ্ধতিতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বা মূল্য ৭ টাকা বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের উপর ছেড়ে দিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। দেশ থেকে সরাসরি অর্থ পাচার চেষ্টা করলে অনেকটাই কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিন্তু বিদেশে যে আর্থিক লেনদেন হচ্ছে তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটা চলছে এবং আগামিতেও চলতে থাকবে।

আমরা মনে করি, দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। সেই কমিশন দুর্নীতি সংক্রান্ত আইনগুলোকে পরিবর্তন/সংশাধনের সুপারিশ করতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ যারা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন অথচ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ